আপনার দোকান, স্কুল বা সার্ভিসের ওয়েবসাইট আছে, কিন্তু গুগল থেকে মানুষ আসছে না? অনেক সময় সমস্যাটা ডিজাইনে নয়, শব্দে। আপনি ওয়েবসাইটে যে ভাষায় লিখেছেন, গ্রাহক হয়তো সেই ভাষায় খোঁজেন না। কেউ লেখেন "ওয়েবসাইট বানাতে কত টাকা লাগে", কেউ লেখেন "website banate koto taka lage", আবার কেউ লেখেন "website design cost in Noakhali"। এই তিনটা খোঁজ আসলে একই প্রশ্ন। বাংলা কিওয়ার্ড রিসার্চ মানে হলো খুঁজে বের করা আপনার গ্রাহক ঠিক কোন শব্দে, কোন ভাষায় গুগলে খোঁজেন, তারপর সেই শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবে লেখায় ব্যবহার করা। এই লেখায় ধাপে ধাপে দেখাব বাংলা কিওয়ার্ড রিসার্চ কীভাবে করবেন, কোন কোন ফ্রি টুল লাগবে, আর মিশ্র ভাষার খোঁজের জন্য কীভাবে লিখবেন।
বাংলাদেশে মানুষ গুগলে তিনভাবে খোঁজে
বাংলাদেশের মানুষের সার্চ করার ধরন একটু আলাদা। মোটামুটি তিন ধরনের খোঁজ দেখা যায়:
| ধরন | উদাহরণ | কারা বেশি খোঁজেন |
|---|---|---|
| বাংলা হরফে | নোয়াখালীতে ওয়েবসাইট ডিজাইন | যাঁরা ফোনে বাংলা কিবোর্ড ব্যবহার করেন, ভয়েস সার্চ করেন |
| বাংলিশ (ইংরেজি হরফে বাংলা) | website design koto taka | যাঁরা বাংলা টাইপ করতে অভ্যস্ত নন |
| ইংরেজিতে | web hosting in Noakhali | ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, প্রবাসী আত্মীয় |
অনেকে আবার মিশিয়েও লেখেন, যেমন "ফ্রি ডোমেইন hosting" বা "Umrah প্যাকেজ নোয়াখালী"। তাই শুধু ইংরেজিতে কিওয়ার্ড খুঁজলে আপনি অনেক গ্রাহক হারাবেন। আবার শুধু বাংলায় লিখলেও ইংরেজিতে খোঁজা মানুষ আপনাকে পাবেন না।
ধাপ ১: গ্রাহকের মুখের কথা লিখে ফেলুন
কোনো টুল খোলার আগে একটা খাতা নিন। গত এক মাসে গ্রাহকেরা ফোনে, ফেসবুক মেসেজে বা দোকানে এসে কী কী প্রশ্ন করেছেন, হুবহু লিখে ফেলুন। যেমন:
- "ভাই, একটা অনলাইন শপ বানাতে কত খরচ?"
- ".com.bd ডোমেইন কীভাবে নেব?"
- "বিকাশে পেমেন্ট নেওয়া যায় এমন ওয়েবসাইট"
এগুলোই আপনার প্রথম কিওয়ার্ড তালিকা। মানুষ যেভাবে মুখে প্রশ্ন করেন, অনেকটা সেভাবেই গুগলে টাইপ করেন, বিশেষ করে ভয়েস সার্চে।
ধাপ ২: গুগলের অটোকমপ্লিট দেখুন
গুগলের সার্চ বক্সে কিছু লিখতে শুরু করলেই নিচে কিছু পরামর্শ আসে। এগুলো আসে মানুষ আসলে যা খোঁজেন সেখান থেকে। এটা সবচেয়ে সহজ আর ফ্রি কিওয়ার্ড টুল।
- ইনকগনিটো বা প্রাইভেট উইন্ডো খুলুন, যাতে আপনার আগের সার্চ প্রভাব না ফেলে।
- বাংলায় লিখুন "ওয়েবসাইট" আর একটা স্পেস দিন। কী কী পরামর্শ আসে লিখে রাখুন।
- একই কাজ বাংলিশে ("website ") আর ইংরেজিতে করুন।
- শব্দের আগে "কীভাবে", "কত", "সেরা", "কোথায়" লাগিয়ে দেখুন।
সার্চ রেজাল্ট পেজের নিচে "Related searches" আর মাঝখানে "People also ask" অংশেও অনেক কাজের প্রশ্ন পাবেন। এগুলো দিয়ে লেখার FAQ অংশ বানানো যায়।
ধাপ ৩: Google Search Console-এর আসল ডেটা দেখুন
আপনার ওয়েবসাইট যদি কিছুদিন ধরে চালু থাকে, তাহলে সবচেয়ে মূল্যবান তথ্য আছে Google Search Console-এ। এটা ফ্রি। Performance রিপোর্টের Queries ট্যাবে দেখবেন মানুষ কোন কোন শব্দ লিখে আপনার সাইট গুগলে দেখেছেন আর ক্লিক করেছেন।
- যে খোঁজে Impressions বেশি কিন্তু ক্লিক কম, সেই পেজের টাইটেল আর বর্ণনা ভালো করুন।
- যে খোঁজে আপনার পজিশন ৮ থেকে ২০-এর মধ্যে, সেই পেজে আরও তথ্য যোগ করুন। প্রথম পাতায় ওঠার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এগুলোরই।
- বাংলা, বাংলিশ আর ইংরেজি খোঁজগুলো আলাদা করে দেখুন। কোন ভাষায় মানুষ আপনাকে বেশি খোঁজেন বুঝতে পারবেন।
Search Console কীভাবে চালু করবেন, তা বিস্তারিত আছে আমাদের Google Search Console গাইডে।
ধাপ ৪: Google Keyword Planner দিয়ে তুলনা করুন
Google Ads-এর ভেতরে Keyword Planner নামে একটা টুল আছে। Google Ads অ্যাকাউন্ট খুলে বিজ্ঞাপন না চালিয়েও এটা ব্যবহার করা যায়। এখানে কোনো শব্দ দিলে দেখায় মাসে আনুমানিক কতবার খোঁজা হয় আর প্রতিযোগিতা কেমন।
- লোকেশন হিসেবে Bangladesh বেছে নিন।
- বিজ্ঞাপন না চালালে সংখ্যাগুলো একটা রেঞ্জ হিসেবে দেখায় (যেমন ১০০–১ হাজার)। তুলনার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
- বাংলা হরফের অনেক খোঁজের ডেটা এখানে কম দেখায়। তাই শুধু এর ওপর ভরসা করবেন না। অটোকমপ্লিট আর Search Console-এর সাথে মিলিয়ে দেখুন।
ধাপ ৫: কিওয়ার্ডগুলো দলে ভাগ করুন
তালিকায় অনেক শব্দ জমে যাবে। এবার একই অর্থের শব্দগুলো এক দলে রাখুন। প্রতিটা দলের জন্য একটা পেজ বা একটা লেখা।
| দল | শব্দগুলো | কোথায় ব্যবহার করবেন |
|---|---|---|
| খরচ | ওয়েবসাইট বানাতে কত টাকা লাগে, website design cost, ওয়েবসাইটের দাম | একটা খরচ বোঝানো আর্টিকেল |
| সার্ভিস + এলাকা | নোয়াখালীতে ওয়েবসাইট ডিজাইন, web design company Noakhali | সার্ভিস পেজ |
| কীভাবে করবেন | ফেসবুক পেজ থেকে অনলাইন শপ, f-commerce website | গাইড আর্টিকেল |
খেয়াল রাখবেন, একই দলের জন্য দুটো আলাদা পেজ বানালে পেজ দুটো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। তখন দুটোই দুর্বল হয়ে যায়।
ধাপ ৬: মিশ্র ভাষার খোঁজের জন্য কীভাবে লিখবেন
এটাই বাংলাদেশি ওয়েবসাইটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েকটা কাজের নিয়ম:
- পেজের মূল ভাষা একটা রাখুন। ইংরেজি পেজে কয়েকটা জনপ্রিয় বাংলা শব্দ বা একটা ছোট বাংলা সারাংশ রাখতে পারেন। বাংলা আর্টিকেলে ইংরেজি পরিভাষা (hosting, domain, SEO) যেমন আছে তেমন রাখুন, কারণ মানুষ এগুলো ইংরেজিতেই খোঁজেন।
- বাংলিশ জোর করে লিখবেন না। "koto taka" ধরনের শব্দ লেখায় ঢুকালে পড়তে খারাপ লাগে। গুগল এখন অর্থ বুঝতে পারে। বাংলা লেখা ভালো হলে বাংলিশ খোঁজেও অনেক সময় আপনার পেজ দেখায়।
- টাইটেল আর প্রথম অনুচ্ছেদে মূল কিওয়ার্ড দিন। একবার স্বাভাবিকভাবে দিলেই যথেষ্ট। একই শব্দ বারবার লিখলে লেখা কৃত্রিম লাগে।
- প্রশ্ন-উত্তর অংশ রাখুন। মানুষের আসল প্রশ্নগুলো হুবহু শিরোনাম করে উত্তর দিন। এতে "People also ask"-এ আসার সুযোগ বাড়ে।
- এলাকার নাম স্বাভাবিকভাবে লিখুন। নোয়াখালী, মাইজদী, চৌমুহনী, বেগমগঞ্জ, যেখানে আপনি সত্যিই সেবা দেন।
একটা উদাহরণ
ধরুন আপনি ফেসবুকে কাপড় বিক্রি করেন আর একটা ওয়েবসাইট চান। অটোকমপ্লিটে দেখলেন মানুষ খোঁজে "ফেসবুক পেজ থেকে ওয়েবসাইট", "f commerce website", "অনলাইন শপ বানাতে কত খরচ"। প্রথম দুটো একই উদ্দেশ্যের খোঁজ, তাই এগুলো এক দলে যাবে আর একটা গাইড পেজ যথেষ্ট। তৃতীয়টা খরচের প্রশ্ন, তাই আলাদা লেখা লাগবে। এরপর সার্ভিস পেজে লিখবেন আপনি কীভাবে ফেসবুক সেলারদের জন্য ওয়েবসাইট বানান, আর গাইড থেকে সার্ভিস পেজে লিংক দেবেন।
"আমার কাছে" ধরনের লোকাল খোঁজ
অনেকে এলাকার নাম না লিখে শুধু লেখেন "কম্পিউটার দোকান near me" বা "কাছের ক্লিনিক"। এই ধরনের খোঁজে গুগল সাধারণত ওয়েবসাইটের আগে ম্যাপে কাছের ব্যবসাগুলো দেখায়। সেখানে আসতে হলে কিওয়ার্ডের পাশাপাশি একটা পূর্ণ Google Business Profile দরকার। সেখানে থাকবে সঠিক ঠিকানা, ফোন, খোলার সময়, ছবি আর আসল রিভিউ। প্রোফাইলের বিবরণেও গ্রাহকের ভাষার শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবে লিখুন। ওয়েবসাইট আর প্রোফাইলে একই নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বর রাখবেন। এতে গুগল বুঝতে পারে দুটো একই ব্যবসার।
ছোট ব্যবসার জন্য মাসিক কিওয়ার্ড রুটিন
কিওয়ার্ড রিসার্চ একবার করে ভুলে যাওয়ার কাজ নয়। মানুষের খোঁজার ধরন মৌসুম আর সময়ের সাথে বদলায়। যেমন রমজানের আগে "ইফতার অর্ডার", স্কুল ভর্তির সময় "ভর্তি ফরম অনলাইন", ঈদের আগে "অনলাইন শপিং"। মাসে আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে এই কাজগুলো করুন:
- Search Console-এ গত ২৮ দিনের নতুন খোঁজগুলো দেখুন আর খাতায় তুলুন।
- অন্তত একটা নতুন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একটা ছোট আর্টিকেল লিখুন, বা কোনো পুরোনো লেখায় নতুন অংশ যোগ করুন।
- যে দুটো পেজ প্রথম পাতার কাছাকাছি আছে, সেগুলোর টাইটেল আর প্রশ্ন-উত্তর অংশ ভালো করুন।
- সামনের মাসের উৎসব বা মৌসুমের কথা ভেবে আগে থেকেই লেখা তৈরি রাখুন।
নিয়মিত এভাবে কাজ করলে কয়েক মাসের মধ্যে আপনার ওয়েবসাইটে এমন অনেক পেজ জমে যাবে যেগুলো গ্রাহকের আসল প্রশ্নের উত্তর দেয়। গুগল ঠিক এই ধরনের সাইটকেই সামনে আনে।
যে ভুলগুলো এড়াবেন
- শুধু বেশি খোঁজা শব্দের পেছনে দৌড়ানো। ছোট কিন্তু নির্দিষ্ট খোঁজে ("নোয়াখালীতে স্কুল ওয়েবসাইট") গ্রাহক পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- অন্য সাইটের লেখা কপি করা। গুগল কপি করা লেখা পছন্দ করে না।
- একই কিওয়ার্ডে অনেক পেজ বানানো।
- লেখা প্রকাশের পর আর ফিরে না দেখা। প্রতি মাসে Search Console দেখে লেখা আপডেট করুন।
সাধারণ প্রশ্ন
বাংলা কিওয়ার্ড রিসার্চের জন্য কি টাকা দিয়ে টুল কিনতে হবে?
না। গুগল অটোকমপ্লিট, Google Search Console আর Keyword Planner ফ্রি। ছোট ব্যবসার জন্য এগুলোই যথেষ্ট।
ওয়েবসাইট বাংলায় হবে নাকি ইংরেজিতে?
আপনার গ্রাহক কোন ভাষায় বেশি খোঁজেন, তার ওপর নির্ভর করে। অনেক ব্যবসার জন্য ইংরেজি পেজের সাথে বাংলা সারাংশ বা আলাদা বাংলা আর্টিকেল ভালো কাজ করে।
বাংলিশ শব্দ কি লেখায় রাখা উচিত?
সাধারণত না। ভালো বাংলা বা ইংরেজিতে লিখুন। গুগল অর্থ বুঝে বাংলিশ খোঁজেও অনেক সময় সেই পেজ দেখায়।
কিওয়ার্ড রিসার্চের পর কতদিনে ফল পাব?
নতুন লেখা গুগলে জায়গা পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে পারে। নিয়মিত লেখা আর আপডেট করলে ধীরে ধীরে ফল আসে।
নিজে সময় না পেলে আমাদের SEO সার্ভিস দেখতে পারেন। আপনার ব্যবসার জন্য কোন কিওয়ার্ড ঠিক হবে জানতে যোগাযোগ করুন।